রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার কি কার্যকর হতে চলেছে সপ্তম বেতন কমিশন (7th Pay Commission)? সম্প্রতি অর্থ দফতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে প্রশাসনিক অন্দরে এই জল্পনা তীব্র হয়েছে।
রাজ্যের বিভিন্ন দফতরে কর্মরত সমস্ত স্তরের কর্মচারীদের বর্তমান বেতন ও ভাতার বিস্তারিত খতিয়ান তলব করেছে অর্থ দফতর। উৎসবের মরশুমের মুখেই প্রশাসনের এমন সক্রিয়তায় কর্মচারী মহলে তৈরি হয়েছে নতুন আশার আলো।
কর্মচারীদের বিস্তারিত তথ্য তলব
অর্থ দফতরের জারি করা নির্দেশিকায় রাজ্যের প্রতিটি প্রশাসনিক বিভাগ ও দফতরকে তাদের অধীনে থাকা স্থায়ী, অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের যাবতীয় হিসাব নির্দিষ্ট বয়ানে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
বর্তমানে কর্মীরা কোন মূল বেতন (Basic Pay) এবং গ্রেড পেতে রয়েছেন।
মহার্ঘ ভাতা (DA), বাড়িভাড়া ভাতা (HRA) এবং চিকিৎসা ভাতা (Medical Allowance) বাবদ প্রতি মাসে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে।
নতুন বেতন কাঠামো চালু হলে রাজ্য সরকারের রাজকোষে প্রতি মাসে ও প্রতি বছরে আনুমানিক কত আর্থিক বোঝা চাপতে পারে, তার প্রাথমিক সমীক্ষা।
মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস ও ঘোষণা
উৎসবের মরশুমের মুখেই রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক স্বস্তি দিতে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আগেই স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, পুজোর আগেই কর্মচারীদের অ্যাকাউন্টে অগ্রিম বেতন পৌঁছে যাবে এবং সেই সঙ্গে ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) প্রদান করা হবে। পঞ্চমীর দিন থেকেই কর্মীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এই অর্থ জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে, রাজ্যে গঠিত নতুন সপ্তম পে কমিশনের সুপারিশ দ্রুত চূড়ান্ত করে তা কার্যকর করার পথে এগোবে রাজ্য সরকার।
সপ্তম পে কমিশন কার্যকর হলে কতটা বাড়তে পারে বেতন?
সপ্তম পে কমিশন বাস্তবায়িত হলে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে চলেছে:
ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের প্রভাব: কেন্দ্রীয় পে কমিশনের অনুরূপ নীতি অনুসরণ করা হলে কর্মচারীদের মূল বেতনে (Basic Pay) বড়সড় বৃদ্ধি ঘটবে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কার্যকর হলে বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীদের বেসিক পে একধাক্কায় প্রায় আড়াই গুণ বা তারও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।
বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধি: বর্তমানে রাজ্য সরকারি কর্মীদের বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির (Annual Increment) হার যেখানে ৩ শতাংশ রয়েছে, সপ্তম পে কমিশনের কার্যপরিধিতে তা বাড়িয়ে ন্যূনতম ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে।
ন্যূনতম বেতনের নতুন মানদণ্ড: কর্মচারীদের ন্যূনতম বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে এবার ৫ সদস্যের একটি পরিবার এবং দৈনিক ৩,৪৯০ ক্যালোরির পুষ্টির প্রয়োজনীয়তাকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হচ্ছে, যা কার্যকর হলে সর্বনিম্ন স্তরের কর্মীদের মূল বেতনও বর্তমানের চেয়ে অনেকটা বেড়ে যাবে।
ভাতা ও অবসরকালীন সুবিধা: মূল বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিয়মমাফিক বাড়িভাড়া ভাতা (HRA), মহার্ঘ ভাতা (DA) এবং গ্র্যাচুইটি ও পেনশনের মতো অবসরকালীন আর্থিক সুবিধাতেও বড়সড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সপ্তম পে কমিশন চালুর সম্ভাবনা কতটা?
কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীরা দীর্ঘ সময় ধরে সপ্তম পে কমিশনের সুবিধা উপভোগ করছেন। এমনকি দেশের সিংহভাগ রাজ্যই তাদের কর্মীদের জন্য এই সুবিধা লাগু করে ফেলেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে এখনও ষষ্ঠ বেতন কমিশনের ভিত্তিতেই বেতন প্রদান করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় হারের তুলনায় মহার্ঘ ভাতার যে বড়সড় ফারাক রয়েছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ ও আন্দোলন জারি রয়েছে কর্মচারী সংগঠনগুলির মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে নবান্নের এই তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগকে নতুন বেতন কমিশনের রূপরেখা তৈরির প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন: ৬,৯০৮ টাকা বোনাস পাবেন এইসব কর্মীরা, আপনি পাবেন কি জানুন
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বেতন কমিশন গঠন বা কার্যকর করার আগে সরকারি কোষাগারের সার্বিক আর্থিক সঙ্গতি ও সম্ভাব্য ব্যয়ের মাপকাঠি খতিয়ে দেখাই রুটিন প্রক্রিয়া। যদি রাজ্য সরকার সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের পথে এগিয়ে যায়, তবে কর্মচারীদের মূল বেতন যেমন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে, তেমনই ডিএ সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের জটিলতারও স্থায়ী নিষ্পত্তি ঘটতে পারে।
